
সব ধর্মের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে দেশ গড়তে চাই : প্রধানমন্ত্রী
মোঃ সুমন সরদার
বাংলাদেশের হাজার বছরের সুদৃঢ় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির গৌরবময় ঐতিহ্যকে সমুন্নত রেখে দেশের সকল ধর্ম, বর্ণ, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও পেশাজীবী মানুষকে এক সুতোয় গেঁথে একটি সুন্দর, বৈষম্যহীন ও প্রত্যাশিত নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলার দৃপ্ত অঙ্গীকা প্রকাশ করেছেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় স্মরণ করিয়ে দেন যে, ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী মহান মুক্তিযুদ্ধে এ দেশের হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানসহ সব ধর্মের সাধারণ মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করে দেশকে শত্রুমুক্ত ও স্বাধীন করেছিলেন। কাজেই সেই স্বাধীনতার প্রকৃত সুফল ও অর্থনৈতিক মুক্তি প্রতিটি নাগরিকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হলে এবং দেশকে একটি আত্মনির্ভরশীল ও মর্যাদাবান রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে সর্বস্তরের জনগণকে সঙ্গে নিয়েই দেশ পুনর্গঠনের মূল কাজ তরান্বিত করতে হবে।
গতকাল মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর ২০২৬) দুপুরে রংপুরের পাগলাপীরে স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠন আয়োজিত এক বিশাল ও সুসংগঠিত জনাকীর্ণ পথসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। রংপুরের এই ঐতিহাসিক আগমনকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই সমগ্র অঞ্চলজুড়ে দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের মাঝে নজিরবিহীন উদ্দীপনা ও উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
পথসভায় উপস্থিত অগণিত মানুষের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “আমাদের প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশে কোনো দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক নেই। আমাদের একমাত্র পরিচয় আমরা সবাই স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের গর্বিত নাগরিক। আবহমানকাল ধরে এই ভূখণ্ডে সব ধর্মের মানুষ পরম শান্তিতে মিলেমিশে বসবাস করে আসছে। কঠোর পরিশ্রম, পরমতসহিষ্ণুতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের মাধ্যমে আমরা এই দেশকে একটি সমৃদ্ধশালী রাষ্ট্রে রূপান্তর করব—এটিই হোক আমাদের সকলের জাতীয় শপথ।”
জনগণের পবিত্র আমানত ও বৈপ্লবিক সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি
সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, “গত ১২ তারিখের অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচনে দেশের সাধারণ মানুষ বিপুল ভোটাধিকার প্রয়োগ করে বিএনপিকে দেশ পরিচালনার পবিত্র ও মহৎ দায়িত্ব অর্পণ করেছে। আমরা জনগণকে সুস্পষ্টভাবে বলতে চাই, ক্ষমতার মসনদ আমাদের জন্য কোনো ভোগের জায়গা নয়, বরং এটি দেশের খেটে খাওয়া কোটি মানুষের সেবা করার একটি পবিত্র সুযোগ।
সরকার গঠনের প্রথম দিন থেকেই আমাদের অগ্রাধিকার ছিল দেশের অবহেলিত, প্রান্তিক ও কৃষক-শ্রমিক শ্রেণির মানুষের পাশে শক্তভাবে গিয়ে দাঁড়ানো। সামাজিক বৈষম্য দূর করে সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের সম্মানজনক জীবনযাত্রা নিশ্চিত করতে আমরা স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি নানা বৈপ্লবিক সামাজিক নিরাপত্তা প্রকল্প গ্রহণ করছি।”
কৃষি ও কৃষকবান্ধব নীতিমালার বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, “কৃষক হলো আমাদের জাতীয় অর্থনীতির আসল প্রাণশক্তি। তাদের হাড়ভাঙা খাটুনির ফলেই আজ আমরা অন্ন সংস্থান করতে পারছি। তাই প্রান্তিক কৃষকদের ঘাড়ে চেপে থাকা অর্থনৈতিক দেনার বোঝা এক লহমায় হালকা করতে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সম্পূর্ণ মওকুফ ঘোষণা করা হয়েছে। একই সাথে দেশের প্রতিটি পরিবার ও কৃষকের মৌলিক অধিকার ও সরকারি সহায়তার সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে সার্বজনীন ‘ফ্যামিলি কার্ড’ এবং ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা হয়েছে। এই কার্ডের মাধ্যমে প্রান্তিক পরিবারগুলো সরাসরি রাষ্ট্রীয় সহায়তার আওতায় আসবে এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য চিরতরে বন্ধ হবে।”
তিনি আরও জানান, কেবল কৃষকদের জন্যই নয়, সমাজের ধর্মীয় অনুশাসন ও নৈতিকতা রক্ষার প্রধান কারিগর ইমাম, মুয়াজ্জিন এবং অন্যান্য সকল ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় গুরুজনদের আত্মমর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিশেষ সরকারি ভাতার প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা বাস্তবায়িত হচ্ছে। মেহনতি মানুষের কল্যাণকে কেন্দ্র করেই বর্তমান সরকারের প্রতিটি নীতি ও কর্মসূচি প্রণীত হবে বলে তিনি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেন।
শারদীয় দুর্গোৎসবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সুদৃঢ় বার্তা
চলমান শারদীয় দুর্গোৎসবের শুভ মুহূর্ত স্মরণে এনে সনাতন ধর্মাবলম্বী নাগরিকদের আন্তরিক শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বর্তমানে পুরো দেশজুড়ে শারদীয় দুর্গোৎসব উদযাপিত হচ্ছে। এটি আমাদের হিন্দু ধর্মাবলম্বী ভাই-বোনদের এক মহা আনন্দের ও পূণ্যময় সময়। আমি এই আনন্দঘন শুভ মুহূর্তে সারাদেশের সকল নাগরিকদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছি। বাংলাদেশ এমন এক অনন্য দেশ, যেখানে প্রতিটি ধর্মীয় উৎসব সব ধর্মের মানুষের পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব ও সৌহার্দ্যের মিলনমেলায় পরিণত হয়। কোনো অপশক্তি যেন আমাদের এই সম্প্রীতির সুদৃঢ় শিকড়ে আঘাত হানতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।”
প্রধানমন্ত্রী সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বলেন, “আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে যেভাবে সব ধর্মের মানুষ যৌথভাবে রক্ত দিয়েছেন, ঘাম ঝরিয়েছেন—ঠিক একইভাবে আজকে আমাদের অর্থনীতিকে মজবুত করতে, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করতে এবং একটি ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গঠন করতে সব ধর্মের মানুষকে দল-মত, ধর্ম ও জাতিগত পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে একসাথে কাজ করতে হবে। এই বাংলাদেশ আমার, আপনার, আমাদের সবার। তাই এই দেশের প্রতিটি ইঞ্চি মাটির সমৃদ্ধি ও সুন্দর ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের দায়িত্বও আমাদের সকলের কাঁধে। আসুন, ভেদাভেদ ভুলে নতুন উদ্যমে সবাই মিলে একটি প্রত্যাশিত ও সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ গড়ে তুলি।”
আজকের এই ঐতিহাসিক পথসভায় জেলা ও কেন্দ্রীয় বিএনপির উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, স্থানীয় সিভিল প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ এবং উত্তরবঙ্গের সর্বস্তরের হাজার হাজার সাধারণ জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন।